ফরিদপুরে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে ধরা পড়ছেন রুই-কাতলারা

https://ift.tt/eA8V8J
ফরিদপুর, ১৬ আগস্ট - চুনোপুঁটি থেকে তরতর করে একেকজন পরিণত হচ্ছিলেন রাঘববোয়ালে। কিন্তু আচমকা টান পড়ে বড়শিতে। ফরিদপুরে আওয়ামী লীগে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে একের পর এক ধরা পড়ছেন মাঝারি আকারের রুই-কাতলারা। তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বেশকিছু নেতাসহ জনপ্রতিনিধি, চাকরিজীবী, সাংবাদিকসহ আরও অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ফরিদপুরের আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের খবরটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। এতে জেলা আওয়ামী লীগ অনেকটা টালমাটাল হয়ে পড়লেও দুর্নীতিবিরোধী এ অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুরবাসী। সর্বশেষ ঈদের আগের দিন পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার নাজমুল হাসান লেভী, জেলা শ্রমিকলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক বিল্লাল হোসেন ও শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান ফারহান। এর আগে গ্রেপ্তার হন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত এবং তার ভাই প্রেসক্লাবের বহিষ্কৃত সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেল, পৌর কাউন্সিলর মামুনুর রহমান, ডিক্রিরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন আবুসহ কয়েক নেতা। এ সম্পর্কে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান জানান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়িতে হামলার ঘটনায় আটক করা হয় সাজ্জাদ হোসেন বরকত, ইমতিয়াজ হাসান রুবেলসহ কয়েকজনকে। পরে দুই হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং মামলা করে সিআইডি। সেই মামলায় বরকত-রুবেলের স্বীকারোক্তিতে অনেকের নাম এসেছে। সিআইডির চাহিদা মোতাবেক তালিকা অনুযায়ী তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। জানা যায়, বিগত ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দুর্যোগ নেমে আসে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগে। দলটির প্রবীণ, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা নানা কারণে দলের কর্মকা- থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। দলে অনুপ্রবেশ ঘটে বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা হাইব্রিডদের। তাদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েন এক সময়ের তুখোড় নেতারা। যারা ফরিদপুরে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে তাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন, তাদের নিগৃহীত হতে হয়। করা হয় অপমান, লাঞ্ছিত। দলের প্রবীণ-নবীন কয়েক নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। আরও পড়ুন: র্যাবের তদন্ত দলকে সিনহা হত্যার বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা জানা যায়, একটি চক্র রাজনীতির নোংরা খেলায় মেতে ওঠে। এ চক্রটির হাতে ক্ষমতা থাকায় তারা দিনকে রাত আর রাতকে দিন ভাবতে থাকেন। এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা এই চক্রটি করেনি। কথিত আছে, বিগত ১০ বছরে ফরিদপুরে বিএনপির নেতারা যতটা নির্যাতনের শিকার না হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি নির্যাতন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা। হাতুড়ি বাহিনী, হেলমেট বাহিনী গঠন করে দলের ত্যাগী ও সরব নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দলীয় কর্মকা- থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। প্রবীণ নেতাদের প্রতি পদে পদে লাঞ্ছিত আর অপমান করা হয়। আওয়ামী লীগ আমলেই অনেক নেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন থেকে। সেখানে বসানো হয় নব্য আওয়ামী লীগারদের। অপমান-লাঞ্ছিত হয়ে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হন কেউ কেউ। অনেকেই আবার রাজনীতি থেকে নীরবে অবসর নেন। কয়েক বছর ধরে ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের হর্তাকর্তা হিসেবে পরিচিত ত্রিরত ফুয়াদ-বরকত-রুবেল এফবিআর দলের পুরনো নেতাদের হটিয়ে তাদের অনুসারীদের দলে অনুপ্রবেশ করান। শহরে যারা নানাভাবে বিতর্কিত, সেইসব ব্যক্তি নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন আলোচিত এই ত্রিরত। ফলে ক্রমেই সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হতে থাকে আওয়ামী লীগ। গোপনে বিএনপির একাংশ এবং জামায়াতের সাথে সখ্য রেখে সদর আসনের এমপির কাছে নিজেদের বড় নেতা জাহির করতে নানা পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে টাকা ছড়িয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বাস-ট্রাক ভাড়া করে লোক এনে শোডাউন করতে থাকেন। বছরের বেশিরভাগ দিনই চলতে থাকে এমন শোডাউন। এরই মাঝে ফরিদপুরের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি দপ্তর থেকে টেন্ডারবাণিজ্য, বদলিবাণিজ্য, কমিশনবাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। জিম্মি করে রাখা হয় ফরিদপুরের বেশির ভাগ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির থাকতে হতো সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই দলীয় মনোনয়ন দিতে দেওয়া হয়নি। টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া হতো। এ ছাড়া যারা ত্রিরতের বিপক্ষে ছিলেন তাদের বাদ দিয়ে নব্য আওয়ামী লীগারদের দলীয় টিকিট দেওয়া হয়েছে। ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও ক্ষমতার দাপট দেখানো হয়। প্রশাসনের সহায়তায় আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতা শামসুল হক ভোলা মাস্টারের মনোনয়নটি অবৈধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ আছে, খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তার মনোনয়নটি অবৈধ ঘোষণা করে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হয় তাদের পছন্দের প্রার্থীকে। সব বিষয়ে ফরিদপুর সদর থেকে হস্তক্ষেপের কারণে অন্য আসনের এমপিদের মনেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এর জন্য আওয়ামী লীগের অনেকেই দায়ী করেন ফুয়াদ, বরকত ও রুবেলকে। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন নিয়েও আছে নানা সমালোচনা। নিজেদের কর্তৃত্ব ঠিক রাখতে এবং দলের পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয় তাদের অনুসারীদের। বাদ পড়েন অনেক ত্যাগী ও প্রবীণ নেতা। শুধু জেলা আওয়ামী লীগই নয়, দলের সহযোগী সংগঠনগুলোকেও একই কায়দায় কমিটি করে ত্যাগীদের বঞ্চিত রাখা হয়। এসব কারণে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ক্ষোভে ফুঁঁসে উঠলে তাদের ওপর নানা নিপীড়ন চালানো হয়। পরে সেইসব নেতার মনে দুঃখ থাকলেও তারা আর প্রতিবাদ করেনি। মাইনাস ফর্র্মুলায় দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। এমনিভাবে দলের একাধিক নেতাকে মাইনাস করে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও তারা হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে তারা একাধিকবার এ বিষয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। তারা আশায় ছিলেন একদিন এই কালো অধ্যায়ের পতন হবে। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে অবশেষে ফাঁদে ধরা পড়েন ফরিদপুরের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত আর ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। ১৬ মে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল সাহার বাড়িতে পরিকল্পিতভাবে দুই দফায় হামলা চালানো হয়। সেই ঘটনায় ১৮ মে সুবল সাহা অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় মামলা করেন। ৭ জুন এ মামলার আসামি হিসেবে শহরের বদরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বরকত-রুবেলসহ নয়জনকে। বরকত-রুবেল গ্রেপ্তার হওয়ায় আওয়ামী লীগের একাংশের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। পরদিন সকালে শহরে আনন্দ মিছিল বের হয়। বিতরণ করা হয় মিষ্টিও। বরকত-রুবেল ধরা পড়ার পর গা-ঢাকা দেন বিতর্কিত কয়েকশ নেতাকর্মী। সূত্র : আমাদের সময় এন এইচ, ১৬ আগস্ট
https://ift.tt/31QiPvy

Post a Comment

0 Comments